দেশজনতা অনলাইন ডেস্ক : শারীরিক প্রতিবন্ধিতা জয় করেছেন ময়মনসিংহের শতাধিক প্রতিবন্ধী নারী। কার্পেট তৈরির কাজ করে হয়েছেন স্বাবলম্বী। তাদের বানানো কার্পেট আজ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে জাপান, আমেরিকা, ফ্রান্স, জার্মানিসহ বেশ কয়েকটি দেশে।
প্রথমে তারা স্থানীয় বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ করতেন। ধীরে ধীরে তাদের কাজের পরিধি বেড়েছে। উৎপাদিত পণ্যের গুণগত মান ভালো হওয়ায় তা বিদেশেও রফতানি হচ্ছে।
ময়মনসিংহ নগরীর বলাশপুর পালপাড়ার মৃত আব্দুল হামিদ মোল্লার মেয়ে ময়না আক্তার (২৬)। ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্থানীয় বাজার থেকে ফেরার সময় রেললাইন পার হতে গিয়ে ট্রেন দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন তিনি। তাকে চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সে সময় হাঁটুর নিচ থেকে তার বাম পা কেটে ফেলা হয়। দেড় মাস চিকিৎসা শেষে পঙ্গু হয়ে বাসায় ফেরেন ময়না।
ময়নার জীবন কীভাবে চলবে–এই নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন তার বাবা আব্দুল হামিদ ও মা সাফিয়া বেগম। ওই বছরের নভেম্বর মাসে মারা যান ময়নার বাবা। পরিবারের উপার্জনক্ষম একমাত্র ব্যক্তিকে হারিয়ে ৪ মেয়ে ও ১ ছেলেকে নিয়ে চিন্তায় পড়েন ময়নার মা সাফিয়া বেগম। এর ১৫ দিনের মাথায় প্রতিবেশী এক ভাইয়ের সহায়তায় ময়না কাজ পান প্রতিবন্ধী নারীদের সংগঠন ময়মনসিংহ মহিলা ক্লাবের কার্পেট কারখানায়।
কার্পেট তৈরির কাজ শিখতে ময়নার সময় লাগে মাত্র ৬ মাস। এরপর থেকে মাইনে পাওয়া শুরু করেন। বর্তমানে ময়নার আয়ে তার ছয় সদস্যের সংসার চলে; ছোট এক বোনের লেখাপড়ার খরচও জোগান তিনি।
ময়না জানান, কার্পেট কারখানায় কাজ শিখে এখন তার জীবন পাল্টে গেছে। এখন নিজেকে আর প্রতিবন্ধী মনে হয় না তার।
ময়নার পরামর্শ, প্রতিবন্ধী অবস্থায় যারা ঘরে বসে আছে, তাদের উচিত কাজ শেখা এবং সে কাজ করা। এটাই সবাইকে স্বাবলম্বী করে তুলবে।
শুধু ময়না নয়; ময়মনসিংহ মহিলা ক্লাবের কার্পেট ও হস্তশিল্প কারখানায় বর্তমানে তার মতো দেড়শ’ প্রতিবন্ধী নারী কাজ করছেন। নিজেদের আয়ে তারা সংসার খরচ চালাচ্ছেন।
ময়মনসিংহ মহিলা ক্লাবের ইনচার্জ তাহমিনা আক্তার জানান, ফ্রান্সের তেইজি ব্রাদার কমিউনিটির ব্রাদারেরা ১৯৯৭ সালে ময়মনসিংহ প্রতিবন্ধী কমিউনিটি সেন্টার নামে একটি বেসরকারি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। পরে প্রতিবন্ধী নারীদের স্বাবলম্বী করতে ২০০০ সালে এই মহিলা ক্লাব প্রতিষ্ঠা করা হয়। ওই সময়ই এখানে কার্পেট ও হস্তশিল্পের কারখানা গড়ে তোলা হয়। অসহায় প্রতিবন্ধী নারীরা কাজ শিখে এখান থেকেই আয়-রোজগার করে থাকেন।
তিনি আরও জানান, প্রতিবন্ধী নারীদের হাতে তৈরি দৃষ্টিনন্দন কার্পেট ও অন্য হস্তশিল্প পণ্য দেশের চাহিদা মিটিয়ে এখন জাপান, আমেরিকা, ফ্রান্স, জার্মানসহ প্রায় ৮-১০টি দেশে যাচ্ছে।
নারী প্রতিবন্ধীদের নানা সমস্যার কথা তুলে ধরে তাহমিনা আক্তার জানান, মহিলা ক্লাবের উৎপাদিত আয় দিয়ে প্রতিবন্ধী নারীদের কাজের মজুরি দেওয়া যায়। তবে তাদের চিকিৎসা, শিক্ষাসহ অন্য সুযোগসুবিধা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার দাবি জানান তিনি।
ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক ড. সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস জানান, সহজ শর্তে এসব প্রতিবন্ধী নারীদের ব্যাংক থেকে এসএমই ঋণের ব্যবস্থা করা জরুরি। বেসরকারিভাবে সহায়তার জন্য সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
Daily Deshjanata দেশ ও জনতার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর

