৮ই মার্চ, ২০২১ ইং | ২৩শে ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | রাত ৯:৩৬

শব্দ নিয়ন্ত্রণে হাসপাতালগুলো উপেক্ষিত কেন?

বারডেমের উল্টোদিকে বিএসএমএমইউয়ের একাধিক রোগীর অভিযোগ, দিনের বেলা তো বটেই রাতেও শব্দের কারণে ঘুমানো কঠিন হয়ে যায়। মহুয়া নামে এক রোগীর স্বজন বলেন, আমাদেরই হর্নে বিরক্তি লাগে, রোগীদের অবস্থা তো আরও খারাপ।

পরিবেশ অধিদফতরের করা  জরিপে দেখা গেছে, সকাল ৯টার দিকে শাহবাগ মোড়ে মিনিটে ১৯টি হর্ন বাজে। তারপর সেটা প্রায় সারাদিন ধরেই চলতে থাকে কম-বেশি। অথচ বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা-২০০৬ অনুযায়ী, নীরব এলাকা হিসেবে হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত বা একই জাতীয় অন্য প্রতিষ্ঠান এবং এর চারিদিকে ১০০ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকাকে বোঝানো হয়েছে ‘নীরব এলাকা’। চলাচলের সময় সেখানে যানবাহনে কোনও হর্ন বাজানো যাবে না। হাসপাতাল, স্কুল-কলেজকে নীরব এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও তার প্রয়োগ নেই। বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে সম্প্রতি সচিবালয়ের চারপাশ ‘নীরব এলাকা’ বা ‘নো হর্ন জোন’ হিসেবে ঘোষিত হওয়ার পর। নতুন ঘোষণায় বলা হয়েছে, জিরো পয়েন্ট, পল্টন মোড় ও সচিবলায় লিংক রোড হয়ে জিরো পয়েন্ট এলাকায় চলাচলকারী কোনও যানবাহন হর্ন বাজাতে পারবে না, বাজালে শাস্তি পেতে হবে।

রাজধানী ঢাকার প্রাণকেন্দ্র শাহবাগ। আর শাহবাগের দুই পাশে দেশের অন্যতম দুটি বড় হাসপাতাল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও বারডেম হাসপাতাল। এ দুটি হাসপাতালের সামনের সড়কে সবসময় প্রচণ্ড হর্ন বাজিয়ে ছুটে চলে গাড়ি।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের পাঁচ তলায় এক সপ্তাহ থেকে ভর্তি আছেন রহমতউল্লাহ। তার ছেলে রাফি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দিনরাত ২৪ ঘণ্টা হর্নের শব্দে অসহ্য হয়ে যাচ্ছি। দিনের বেলায় বাসসহ অন্য গাড়ি আর রাতের বেলায় ট্রাক- এক ভয়ানক অভিজ্ঞতা। এখানে রোগী সুস্থ হবে কী বরং সুস্থ মানুষই অসুস্থ হয়ে যাওয়ার যোগাড়।’

বেসরকারি সংস্থা ওয়ার্ক ফর বেটার বাংলাদেশ রাজধানীর শব্দদূষণ নিয়ে কাজ করেছে। সংস্থাটির বাংলাদেশের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক মারুফ রহমান জানান, জরিপে দেখা গেছে, নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে প্রায় দেড় গুণ বেশি শব্দ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে হয়ে থাকে। মিরপুরের পল্লবীতে সর্বোচ্চ ৯১ দশমিক ৫ ডেসিবেল, মিরপুর-১ এ সর্বোচ্চ ৯৬ ডেসিবেল, ধানমন্ডি বালক বিদ্যালয়ের সামনে সর্বোচ্চ ১০৭ দশমিক ১ ডেসিবেল, নিউমার্কেটের সামনে সর্বোচ্চ ১০৪ দশমিক এক ডেসিবেল, সচিবালয়ের সামনে সর্বোচ্চ ৮৮ ডেসিবেল এবং শাহবাগে সর্বোচ্চ ৯৭ দশমিক ৩ ডেসিবেল শব্দমাত্রা হয়।

হাসপাতালের চারপাশে হর্ন বাজানো নিষেধ কিন্তু কে শোনে কার কথা- মন্তব্য করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া বলেন, ‘হর্ন বাজানো তো এমনিতেই উচিত না। আর হাসপাতাল এলাকায় সেটি আরও উচিত নয়। আমরা নিজেরাই যে কত বিরক্ত হই, রোগীদের কথা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। যেসব রোগী হৃদরোগ, স্ট্রোক নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তাদের জন্য বিষয়টি ভীষণ যন্ত্রণার।’ হাসপাতাল এলাকায় হর্নসহ যেকোনো উচ্চ শব্দের আওয়াজ বন্ধের দাবি জোরালো হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। অপরদিকে, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সদ্যবিদায়ী পরিচালক অধ্যাপক ডা. আফজালুর রহমান বলেন, ‘ভুটানের মতো একটি দেশে যেখানে পাহাড়ের নিচ দিয়ে আঁকাবাঁকা রাস্তা রয়েছে সেখানেও কোনও হর্ন বাজায় না কেউ, উন্নত বিশ্বে তো নয়ই। অথচ আমাদের দেশে কোথায় হাসপাতাল, কোথায় স্কুল সেটা কেউ দেখে না।’ তিনি বলেন, দেশে সচিবালয় এলাকায় হর্ন বাজানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে, একইভাবে হাসপাতালের সামনেও হর্ন বাজানো নিষিদ্ধ করতে হবে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসির উদ্দীন বলেন, ‘হাসপাতালগুলোতে শব্দদূষণ আইন উপেক্ষিত- এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমরা অনেকটা অসহায় অবস্থার মধ্যে আছি। হাসপাতালের চারপাশ ঘিরে নিয়মিত চলাচলের পাশাপাশি চারপাশে অনেক অনুষ্ঠান হয়। এছাড়া কাছেই বিশ্ববিদ্যালয়। শব্দ হাসপাতালে আসে। তবে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবন একেবারে রাস্তার সঙ্গে লাগোয়া। সেখানে যেসব ওয়ার্ড রয়েছে তাতে সুস্থ মানুষই অসুস্থ হয়ে যাওয়ার কথা। আমরা মনে করি, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ যেকোনো হাসপাতালের চারপাশের রাস্তা যদি হর্নমুক্ত রাখা যায় তাহলে পরিবেশ যেমন ভালো থাকবে তেমনি চিকিৎসক ও রোগীরাও স্বস্তিদায়ক পরিবেশে থাকবে।’

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘নীরব এলাকা বলতে এক নম্বরেই রয়েছে হাসপাতাল, তারপর স্কুল। হাসপাতাল ও স্কুলের চারপাশের নীরবতা নিশ্চিত না করে সচিবালয়কে নীরব এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করি।’

বারডেম হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. সাকলায়েন রাসেল হর্ন থেকে বাঁচার জন্য তার চেম্বারে সাউন্ডপ্রুফ ডাবল গ্লাস লাগিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমার চেম্বার পাঁচতলায়, শাহবাগ ঘেঁষে। হর্নের কারণে কোনোভাবেই মনোযোগ দিয়ে রোগী দেখা যায় না। তীব্র গতিতে যখন বাইরে হর্ন বাজে তখন মনোযোগ রাখা যায় না। জোর গলায় রোগীদের সঙ্গে কথা বলতে হয়। এতে মানসিকভাবে চাপ পড়ে রোগী ও চিকিৎসকের। এটি আমাদের প্রতিদিনের সমস্যা। রোগী দেখার মতো কোনও পরিস্থিতিই নাই এখানে।’

তিনি বলেন, ‘এক পাশে বিএসএমএমইউ, আরেক পাশে বারডেম আরেকটু এগুলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। অথচ হর্ন নিয়ে কেউ কথা বলে না। ভয়ানকভাবে আমরা এখানে কাজ করে যাচ্ছি। আর হর্নের সঙ্গে যোগ হয়েছে শাহবাগ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সভা-সমাবেশ। এসব সমাবেশের মাইক লাগানো হয়ে থাকে শাহবাগে। তখন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। রোগী ও আমাদের জন্য খুব কঠিন একটা অবস্থার তৈরি করে।’

পরিবেশ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক মো. সাইফুল আশ্রাব বলেন, ‘বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালায় হাসপাতালকে নীরব এলাকা হিসেবে বলা আছে। কিন্তু সেটা মানা হয় না। প্রায় উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে এ বিধি। তাহলে এটা দেখার দায়িত্ব কার প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘পরিবেশ অধিদফতর, জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশন ও পুলিশের। দায়িত্ব সবারই।’

তবে আমরা শতভাগ পারছি না মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘পরিবেশ অধিদফতরের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। জনবল ও বাজেটের সমস্যা রয়েছে। এরপরও হাসপাতাল ও স্কুলগুলোতে ভবিষ্যতে আরও নজর দেওয়া হবে। তবে জনগণকেও সচেতন হতে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘মানুষ অসচেতন হলে আইন প্রয়োগ করা খুব কঠিন।’

প্রকাশ :ডিসেম্বর ২৯, ২০১৯ ৪:৪০ অপরাহ্ণ