নিজস্ব প্রতিবেদক
বনানীতে ধর্ষণ মামলার বাদীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের কথা স্বীকার করে গতকাল বৃহস্পতিবার আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন শাফাত আহমেদ। তবে তাঁর বর্ণনা আর এজাহারে উল্লেখিত প্রেক্ষাপটের মাঝে কিছু ফারাক রয়েছে জানিয়ে পুলিশের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা বলেন, শাফাতের জবানবন্দিতে এজাহারে উল্লিখিত অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এই মামলার আরেক আসামি সাদমান সাকিফও গতকাল ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তবে তিনি ধর্ষণের অভিযোগ স্বীকার করেননি বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অপরাধ ও তথ্য বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার মিরাশ উদ্দিন বলেন, দুই ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার আসামি শাফাত ও সাদমান স্বীকারোক্তি দেওয়ার পর দুজনকে আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাঁদের জামিনের জন্য আবেদন করা হয়েছে, যার শুনানি হবে আগামী রোববার।
শাফাত ও সাদমানকে গতকাল সকাল ৯টার দিকে আদালতে হাজির করা হয়। মহানগর হাকিম আহসান হাবিব তাঁর খাসকামরায় আসামি শাফাতের এবং মহানগর হাকিম সাব্বির ইয়াছির আহসান চৌধুরী আসামি সাদমানের জবানবন্দি গ্রহণ করেন।
আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জবানবন্দিতে শাফাত বলেছেন, ঘটনার (২৮ মার্চ) ১৫ দিন আগে রাজধানীর পিকাসো রেস্তোরাঁয় মামলার বাদীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পরিচয়ের নেপথ্যে ছিলেন সাদমান সাকিফ, পিকাসো রেস্তোরাঁটির মালিক সাদমানের বাবা মোহাম্মদ হোসেন (জনি)। সেখান থেকেই তাঁদের আলাপ শুরু হয়। ২৮ মার্চ শাফাতের জন্মদিনে বন্ধুরা পার্টির আয়োজন করেন এবং হোটেল বুকিং দেন। ওই দিন সন্ধ্যা সাতটার দিকে তাঁরা হোটেল রেইনট্রিতে যান। পার্টিতে ওই ছাত্রীদের (মামলার বাদী ও তাঁর বান্ধবী) আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তাঁরা সবাই মিলে সুইমিংপুলে এক ঘণ্টার মতো সাঁতার কাটেন। সেখানে একে অপরের সঙ্গে তাঁদের ঘনিষ্ঠতা হয়। সুইমিংপুল থেকে উঠে এসে জন্মদিনের কেক কাটেন, এরপর আগে থেকে বুকিং দেওয়া কক্ষে (স্যুইট) যান তাঁরা।
শাফাতের ভাষ্য, স্যুইটের দুটি কক্ষের একটিতে শাফাত একজনের (বাদী) সঙ্গে এবং আরেকটিতে নাঈম আশরাফ (প্রকৃত নাম আবদুল হালিম) অপর ছাত্রীর (বাদীর বান্ধবী) সঙ্গে ছিলেন। শাফাত ওই ছাত্রীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হলে একপর্যায়ে তিনি (ছাত্রী) কান্নাকাটি শুরু করেন। তখন বুঝিয়ে শান্ত করা হয়, তাঁদের (দুই ছাত্রী) জন্মনিরোধক ওষুধ খাওয়ান। সকালে তাঁরা সবাই হোটেল ছেড়ে চলে যান।
নাঈমের সাত দিনের রিমান্ড
গত বুধবার মুন্সিগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার হওয়া এই মামলার অন্যতম আসামি আবদুল হালিম ওরফে নাঈম আশরাফকে গতকাল আদালতে হাজির করে রিমান্ডের আবেদন করা হয়। আদালত সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
প্রভাবশালী হলেও ছাড় নেই
গতকাল মহাখালীতে উইমেন্স হলিডে মার্কেটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, বনানীতে ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনার তদন্ত চলছে। তদন্তে যার নাম আসবে, যার গাফিলতি থাকবে বা এ ঘটনায় যারা সহযোগিতা করেছে বলে দেখা যাবে, সে যে-ই হোক, যত ক্ষমতাধর ব্যক্তি হোক, তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশের ব্রিফিং
বনানীকাণ্ডের আসামি হালিম ওরফে নাঈমকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানাতে গতকাল ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (কাউন্টার টেররিজম ও ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট) মনিরুল ইসলাম বলেন, শাফাত যৌন সম্পর্ক স্থাপনের কথা স্বীকার করেছেন। তবে কী পরিস্থিতিতে কী হয়েছে, এটা পরে পরিষ্কার হবে। এখনো তদন্ত বাকি আছে। তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী ধর্ষণের যে সংজ্ঞা সে রকম কিছু তথ্য প্রাথমিকভাবে পাওয়া গেছে।
ধর্ষণের ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের কোনো ঘটনা ঘটেছে কি না, এমন এক প্রশ্নের জবাবে মনিরুল ইসলাম বলেন, সব বিষয়ই খতিয়ে দেখা হবে। তবে আইনের ব্যাখ্যায় আর্থিক লেনদেন হলেও ধর্ষণ হতে পারে।
আরেক প্রশ্নের জবাবে মনিরুল বলেন, এখন পর্যন্ত আসামিদের কাছ থেকে কোনো ভিডিও ক্লিপ উদ্ধার করা যায়নি। তিনি বলেন, এ ঘটনার পরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় আসামিরা প্রভাবশালী। কিন্তু এ মামলার ক্ষেত্রে পুলিশ সব অনুরাগ-বিরাগ ও আবেগের ঊর্ধ্বে উঠেই আসামিদের ধরেছে।
গত ২৮ মার্চ রাজধানীর রেইনট্রি হোটেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হন, এই অভিযোগে ৬ মে বনানী থানায় মামলা করেন ঘটনার শিকার এক ছাত্রী। মামলার আসামিরা হলেন আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে শাফাত আহমেদ, তাঁর বন্ধু হালিম ওরফে নাঈম, সাদমান সাকিফ, শাফাতের গাড়িচালক বিল্লাল হোসেন ও দেহরক্ষী রহমত আলী। আসামিরা সবাই গ্রেপ্তার আছেন।
দৈনিক দেশজনতা/এন এইচ
Daily Deshjanata দেশ ও জনতার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর

